বরিশাল ক্রাইম নিউজ ডট কমআ"লীগের ঘোষণাপত্রেও ইতিহাস বিকৃতি - বরিশাল ক্রাইম নিউজ ডট কম
শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৮, , সকাল ৮:৫৩

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ১৬, ২০১৭ ৭:৪৬ অপরাহ্ণ
A- A A+ Print

আ”লীগের ঘোষণাপত্রেও ইতিহাস বিকৃতি

সোহেল সানি // বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ করে আসছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু এর নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগেও যে ইতিহাস বিকৃতির ঘটেছে, সে অভিযোগ করবে কে?আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সংশোধিত ম্যানিফেষ্টোতে বর্ণিত দলপ্রতিষ্ঠার ইতিকথায় বিশেষ করে উদ্যোক্তাকারী নেতৃবর্গ এবং তাঁদের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বর্ণিত ব্যাখ্যা চরম বিকৃতিসুলভ। আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র বা ম্যানিফেষ্টোটির শব্দকোষেই রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ মুক্তির সংগ্রামে একটি নিয়মাতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের ভুমিকায়
অবতীর্ণ হয়ে গৌরববর্ধন করলেও পরিতাপের বিষয় যে তার ঘোষণাপত্রে ব্যবহৃত
শব্দগুচ্ছো একেবারেই বৈপ্লবিক। যেন লেলিলবাদ, মার্কসবাদী কিংবা মাওবাদ
দলটির আদর্শ এবং তা প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্পে বিভোর।
এর কারণ ঊদঘাটন করতে গিয়ে প্রমাণিত এক সত্য উঁকি দিচ্ছে যে আওয়ামী লীগের
ঘোষণাপত্রটির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে চীনপন্থী মওলানা ভাসানীর ন্যাপ
নেতাদের নেতৃত্বে। অধ্যাপক আবু সাইয়িদের পর আসাদুজ্জামান নূর ও নূহ্ উল
আলম লেলিন প্রচার ও প্রকাশণা সম্পাদকের দায়িত্বপালন করেন। এই সময়ে
ঘোষণাপত্রের ভাষাব্যবহারে দেয়া হয় বৈপ্লবিক রূপ এবং নেতৃত্বের বর্ণনায়
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নাম ও অবস্থান মওলানা আব্দুল হামিদ খান
ভাসানীর নীচে নামিয়ে আনা হয়েছে। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের সাড়াজাগানো
কাউন্সিল সভামঞ্চ ও ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রঙবেরঙে সজ্জিত
তোরণচিত্রে সোহরাওয়ার্দীর প্রতিকৃতির আগে শোভা পেয়েছে ভাসানীর
প্রতিকৃতি। প্রথম সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের কথা যেন না পেরে উল্লেখ
করা হয়েছে। আর কেন্দ্রীয় পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক
মাহমুদুল হক ওসমানীর নাম দেয়া তো পরের কথা।
অথচ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে মওলানা ভাসানীও তাঁর নেতা হিসাবে মেনে
নিয়েছিলেন। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অল পাকিস্তান আওয়ামী
লীগের সভাপতি। আর ভাসানী ছিলেন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগ শাখার সভাপতি।
পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নামেও একটি প্রাদেশিক শাখা ছিল।
এসবের কিছুই উল্লেখ নেই আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে। ঐতিহাসিক
যুক্তফ্রন্টের পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নেতা হিসাবে শেরেবাংলা
এ কে ফজলুল হককে আওয়ামী লীগ পূর্বপাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী পদে মেনে
নিয়েছিল, আবার কৃষক শ্রমিক পার্টির নেতা শেরেবাংলাও পাকিস্তান কেন্দ্রীয়
জাতীয় পরিষদ নেতা হিসাবে সোহরাওয়ার্দীকে মেনে নিয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রটি সমৃদ্ধ হতো যদি সোহরাওয়ার্দীর
প্রধানমন্ত্রীত্বে আওয়ামী লীগের দেড় বছর ধরে সারা পাকিস্তান শাসনের কথা
যদি উল্লেখ থাকতো। যদি থাকতো সেই সরকারের দুই প্রদেশের বাঘা বাঘা সেই সব
মন্ত্রীদের নাম। পাশাপাশি বর্ণিত হতে পারতো পাকিস্তানের অধ্যায়ে
কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সরকারের ও পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগ সরকারের
সাফল্যগাঁথা।
‘০২ সালের কাউন্সিল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র যতটুকু অবিকৃত ছিল,
তা কেটেছেঁটে বামপন্থী দুই নেতা আসাদুজ্জামান নূর ও নূহ্ উল আলম লেলিন
এমন অবস্থায় রূপ দিয়েছেন, যা কেবল বিকৃতিগ্রস্ত। সাবেক ছাত্রইউনিয়ন নেতা
অভিনেতা নূর এখন আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রী। অপর ছাত্রইউনিয়ন
নেতা লেলিন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামে ঠাঁই পেলেও বিগত কাউন্সিলে বাদ
পড়েছেন।

ইতিহাস বিকৃতির সূচনা বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়েই শুরু।
আওয়ামী লীগের এমন অভিযোগকে রাষ্ট্রযন্ত্র উপেক্ষা করে চললেও প্রগতিবাদী
গোষ্ঠীদলের কন্ঠ ইতিহাস বিকৃতিকারী প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রশক্তির রাশ
টেনে ধরার পক্ষেই ছিল, এবং আছে। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী
লীগের ইতিহাসেও যে চরম বিকৃতি ঘটেছে। তা দেখার কেউ আছে বলে মনে হয় না।
দলটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রী শেখ আব্দুল আজিজ
ছাড়া কেউ নেই। একেক করে সবাই চলে গেছেন পরলোকে। আওয়ামী লীগের ইতিহাস
লেখার অদম্য ইচ্ছা থেকে দুই যুগ গবেষণার পর একটা ইতিকথা লেখার ধৃষ্টতা
পোষণ করছি। যা ইতিহাস বিকৃতিরোধে কিছুটা হলেও প্রভাব রাখতে পারলে আমার এ
মহৎ প্রচেষ্টা সার্থক হবে।

“আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম ঘোষণাপত্রে যা বলা হয়েছিল”

“ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ্ কেবল মুসলমানের নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ
নির্বিশেষে সমগ্র মানবের। মানবতার চূড়ান্ত মুক্তিসংগ্রাম যাতে বিলম্বিত
না হয়, সেজন্য জনতাকে তাহাদের সমস্ত ব্যক্তিগত এবং দলগত বিভেদ বিসর্জন
দিয়া এককাতারে সমবেত হইতেই মুসলিম লীগ কর্মীসম্মেলন আবেদন জানাইতেছে।”
১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার স্বামীবাগস্থ বিখ্যাত রোজগার্ডেনে
অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কর্মীসম্মেলন থেকে “আওয়ামী মুসলিম লীগ” নামে একটি
দল গঠনের ঘোষণা দিয়ে এই আহবান জানানো হয়।
উপস্থিত তিন শতাধিক কর্মীসমর্থক অকুন্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে নতুন দল গঠনের
সিদ্ধান্তকে করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানায়।
সারা পাকিস্তানভিত্তিক একটি কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কাঠামো গঠনের আগাম
চিন্তাভাবনার অংশ হিসাবে প্রথমে পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ
প্রতিষ্ঠা করা হয়। মূল পরিকল্পনাকারী শুধু নয়, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীই
হলেন দলটির নেপথ্যবিধানদাতা।

“নেতৃবর্গের মধ্যে যোগসূত্র”

১৯৪৯ সালের ৯ জুন ঢাকায় এসে তাঁর বেশ কিছু ভক্তানুসারীসহ দেশবিভাগপূর্ব
আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর
সঙ্গে শলাপরামর্শ করেন। চারদিনের মাথায় ভাসানীকে আহবায়ক ও ইয়ার মোহাম্মদ
খানকে সদস্যসচিব করে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা
হয়।
এরপর রোজগার্ডেন থেকে পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম
প্রচারিত হবার পর সভাপতি হিসাবে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নাম
ঘোষণা করেন আতাউর রহমান খান।
মওলানা ভাসানী সহসভাপতি পদে আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হোসেন, আলী
আহম্মদ খান, আলী আমজাদ খান, আব্দুস সালাম খান, সাধারণ সম্পাদক পদে
শামসুল হক ও যুগ্মসম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, সহ
যুগ্মসম্পাদক পদে একে রফিকুল হোসেন এবং কোষাধ্যক্ষ পদে ইয়ার মোহাম্মদ
খানের নাম ঘোষণা করেন। এরপর শামসুল হক জানান, সভাপতি মহোদয় ৪০ সদস্য
বিশিষ্ট কমিটির বাদবাকী পদে মনোনীত করে তা ঘোষণা করবেন।

“বলা বাহুল্য”

আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্য শুধুমাত্র সদস্যদের একটি তালিকা চূড়ান্তকরণ
হলেও তা কখনও আলোর মুখ দেখেনি।
এমনকি অফিস পরিচালনার জন্য একটি দফতর সম্পাদকের পদও তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
মওলাননা ভাসানী শামসুল হকের আগেই শেখ মুজিব ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি
কারামুক্ত হয়ে ৯০ নম্বর নবাবপুরস্থ বাড়ির একটি কক্ষে দুটো চেয়ার, দুটো
টুল ও একটি টেবিল নিয়ে অফিস খুলে বসেন। মোহাম্মদুল্লাহ নামের এক তরুণ
উকিল স্বেচ্ছায় কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করলে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক
শেখ মুজিব তাকে দপ্তরের কাজে বসিয়ে দেন। ১৯৫৩ সালের প্রথম কাউন্সিলে শেখ
মুজিব সাধারণ সম্পাদক হয়ে মোহাম্মুদুল্লাহকে দপ্তর সম্পাদক নিয়োগ দেন।
১৯৭২ সাল পর্যন্ত মোহামুদুল্লাহ এই পদে ছিলেন। পরে স্পিকার,রাষ্ট্রপতি
করা হলেও শেখ মুজিব হত্যার পর খুনী মোশতাকের উপরাষ্ট্রপতি এবং বিএনপিতে
যোগ দিয়ে বিচারপতি সাত্তারেরও দুদিনের জন্য উপরাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন।
উল্লেখ্য প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন, আলী আমজাদ খান ও
সহযুগ্মসম্পাদক একে রফিকুল হোসেন ১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবর কর্মসূচিপালন
কালে ভাসানী ও শামসুল হক গ্রেফতার হবার পর আতঙ্কিত হয়ে পত্রিকায় বিবৃতি
দিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। শেখ মুজিবের
গ্রেফতারের পর অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক খন্দকার মোশতাক দলের থেকে দূরে সরে
যান।
ফলে ১৯৫৩ সালের প্রথম কাউন্সিলেই কমিটি থেকে বাদ পড়েন তিনি। ১৯৫৪ সালের
মনোনয়ন না পেয়ে মোশতাক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে দাউদকান্দি থেকে জয়ী
হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে শেরেবাংলার
যুক্তফ্রন্টে থাকার কারণে বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিস্কার হন মোশতাক।
১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দ রদ হলে আরেক বহিস্কৃত সহসভাপতি আব্দুস সালাম
খানের সঙ্গে এক হয়ে মোশতাক আওয়ামী মুসলিম লীগ নামেই একটি দলের নাম
টিকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করেন।

“যুগ্ম সম্পাদকের পদ বিলুপ্ত”

আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলেই যুগ্মসম্পাদকের পদ বিলুপ্ত করা হয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যাত্তোর এই পদ পুনরায় সৃষ্টি করা হয়। ১৯৫৩ সালের কাউন্সিলে
সাংগঠনিক, প্রচার ও শ্রম, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদ সৃষ্টি করে তাতে নিয়োগ
দেয়া হয় যথাক্রমে এম কোরবান আলী, আব্দুর রহমান, আব্দুস সামাদ আজাদ ও
তাজউদ্দীন আহমেদকে। সমর্থন করেন। গ্রহণ করেন।

“কেন্দ্রীয় আওয়ামী
মুসলিম লীগ গঠন”

পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় রাজধানী
করাচীতে কেন্দ্রীয় দল গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এজন্য ১৯৫০ সালের ১৩ জুলাই বিভিন্ন প্রদেশের নেতাদের এক ‘প্রতিনিধি
সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। আর এ মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে “নিখিল পাকিস্তান
আওয়ামী মুসলিম লীগ।” নেতৃত্ব গ্রহণ করেন সয়ং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
১৯৫৫ সালে “মুসলিম” শব্দটটি পরিহার করে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে তুলতে
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য দলের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। সেই
থেকে আজ পর্যন্ত “আওয়ামী লীগ” নামে পরিচিত হয়ে আসছে।

“পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগ”

১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন সারা পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় তখন গঠন করা
হয় পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগ।

“আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ভাঙ্গন”

১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগে চরম ভাঙ্গণ দেখা দেয়। যখন কেন্দ্রে ও প্রদেশে
শাসন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। সেটা ছিল দেড় বছরের শাসনামল। পাকিস্তানের
প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর মার্কিন ঘেঁষা বৈদেশিক নীতির বিরুদ্ধে
আওয়ামী লীগে মতবিরোধ দেখা দেয়। পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা
ভাসানীসহ তাঁর অনুসারীরা কাগমারীতে দলের কাউন্সিল করেন।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অবাঙালী মাহমুদুল হক ওসমানী
নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান করেন। মওলানা ভাসানীর “ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি
(ন্যাপ) প্রতিষ্ঠা করে কেন্দ্র ও প্রদেশের সভাপতি হন। কেন্দ্রীয় সাধারণ
সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন যথাক্রমে মাহমুদুল হক ওসমানী ও মাহমুদ আলী।
আওয়ামী লীগ দলের সভাপতির শূন্য পদে মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশকে
মনোনীত করে।

“শামসুল হকের মস্তিষ্কে বিকৃতি”

আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হলেও কার্যত শামসুল হক
কারারুদ্ধ হয়ে পড়েন। যে কারণে তিনি সাংগঠনিক পরিসরে কর্মকান্ড পরিচালনা
করতে পারেননি।
১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবর দলের দ্বিতীয় কর্মসূচি পালনকালে গ্রেফতার হন
মওলানা ভাসানীর সঙ্গেই। যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ওদিন গ্রেফতার
এড়াতে সফল হলেও করাচী থেকে আসার পর গ্রেফতার হয়ে যান।
১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারী তিনি মুক্তি পেলেও ভাসানী-শামসুল হক কারাগারেই
থাকেন। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ হিসাবে শেখ মুজিবকেই দায়িত্বপালন করে যেতে হয়।
শামসুল হক কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েন। কারারুদ্ধ
অবস্থায় আচার আচারণে বিকৃতি ও দিনরাত জিকির করার খবর ছড়িয়ে পড়ে।
এ কথা শুনে তাঁর সুন্দরী স্ত্রী অধ্যাপিকা আফিয়া খাতুন লন্ডন প্রবাসী এক
অবাঙালীকে বিয়ে করে সেখানে সংসার পাতেন। এ খবরশুনে শামসুল হক একরকম
পাগলবনে। আফিয়া খাতুন ছিলেন তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী। বিয়েটা
ছিল প্রেমের পরিণতি।
কারাগার থেকে শামসুল হক পান। ১৯৫৩ সালে ঢাকা সিটি আওয়ামী মুসলিম লীগের
প্রথম কাউন্সিলে শামসুল হককেই প্রধান অতিথি করা হয়। কিন্তু তাঁর
আচার-আচারণে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সভামঞ্চে। তিনি তাঁর
বক্তৃতায় নিজেকে সারা দুনিয়ার “খলিফা” বলে দাবি করে বসেন।
শামসুল হকের আশা এবার ছেড়ে দেয় দলটি। তিনি একসময় লাপাত্তা হয়ে সবার অলক্ষে চলে যান।
এভাবেই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে প্রতিভাবান এ নেতা চিরদিনের
জন্য অন্তর্ধান হয়ে যান। করুণতরভাবে রাজনীতিতে যবনিকাপাত ঘটে সম্ভাবনাময়
শামসুল হক অধ্যায়ের।

“শেখ মুজিবের উত্থান শুরু”

১৯৫৩ সালের প্রথম প্রাদেশিক কাউন্সিলে ভারপ্রাপ্ত থেকে শেখ মুজিবুর
রহমান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে অপ্রতিরোধ্য
হয়ে ওঠেন।
১৯৫৫ সালে আতাউর রহমান খানের মন্ত্রী পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। দলীয়
গঠনতন্ত্রে একই সঙ্গে মন্ত্রীত্ব ও নেতৃত্ব করার বিষয়ে বিধি নিষেধ থাকায়
প্রশ্ন ওঠায় এ পন্থা অবলম্বন করেন তিনি।
১৯৬৫ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে সোহরাওয়ার্দীর রহস্যজনক মৃত্যুতে রাজনীতির
দৃশ্যপট বদলে যায়।
শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন দলের কান্ডারী। ১৯৬৬ সালে প্রদেশের সভাপতি পদ গ্রহণ
করেন এবং সাধারণ সম্পাদক করেন তাজউদ্দীন আহমেদকে।
তখনও নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে নওয়াবজাদা নসুরউল্লাহ খান
ও সাধারণ সম্পাদক পদে জহিরুদ্দীন।
১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফাকে কেন্দ্র করে জেনারেল আইয়ুব খান আগরতলা
ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসাতে চান শেখ মুজিবকে। ফলে তিনি অবিসংবাদী নেতায়
পরিনত হন। ১৯৬৯ এর ছাত্রসমাজের গণঅভ্যুত্থান তাঁকে এনে দেয় “বঙ্গবন্ধু”
খেতাব।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আওয়ামী লীগেরও
সভাপতির পদ অলংকৃত করেন।
সাধারণ সম্পাদক করা হয় এএইচএম কামরুজ্জামানকে। নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি
পাকিস্তানের রাজনীতিতে “কিংবদন্তী” হয়ে ওঠেন। পাকিস্তানের
প্রধানমন্ত্রীত্ব হাতের মুঠঠোয় থেকে খসে যায় সামরিক জান্তা জেনারেল
ইয়াহিয়া ও নির্বাচনে সংখ্যালঘু দল পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টোর
ষড়যন্ত্রের কারণে।

১৯৭১

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ নেতৃত্বদানকারী সংগঠন হিসাবে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ
পরিনত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে। বঙ্গবন্ধু থেকে তিনি বাংলাদেশের
স্বাধীনতার স্থপতি হিসাবে হয়ে ওঠেন “জাতির পিতা।”

“জন্মসূত্র”

ভারত উপমহাদেশে শতশত দল গঠিত হলেও স্বাধীনতার পতাকাবাহী প্রধান দল
তিনটি। একটি দলের প্রতিষ্ঠার সূত্র ধরে ঐতিহাসিক মুক্তিসংগ্রামের জন্য
তিনটি দলের অভ্যুদয়। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লী।
কংগ্রস প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেন অক্টেভিয়ান হিউম ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি উমেশ ব্যানার্জী।
মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা মহামান্য আগা খান ও প্রস্তাবক নবাব স্যার সলিমুল্লাহ।
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও প্রস্তাবক মওলানা
আব্দুল হামিদ খান ভাসানী।
১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় কংগ্রেস,১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ
ও ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ জন্মলাভ করে।

রাজনৈতিক সূত্র
“কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা”

১৮৮৪ সালের মধ্যবর্তীকালীন উচ্চপদস্থ ইংরেজ আমলাঅ্যালান অক্টোভিয়াম হিউম
দেশের মানুষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি এক
খোলা চিঠির মারফত ভারতীয়দের নৈতিক, মানসিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জাগরণের
লক্ষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের একটি সমিতি গঠনের আহবান
জানান।
লর্ড রিপনের শাসনামলে ১৮৮৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর “ভারতীয় জাতীয় ইউনিয়ন
(ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ইউনিয়ন) নামে একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে।
এরপর এ ব্যানারেই ১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বাইতে সর্ব ভারতীয়
প্রতিনিধিদের এক কংগ্রেস আহবান করা হয়।
সম্মেলনের সিদ্ধান্তক্রমে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ইউনিয়েনের নাম ঈশৎ পরিবর্তন
করে “ইউনিয়ন” শব্দটটি তুলে দিয়ে “কংগ্রস” শব্দটি স্থাপন করা হয়।
এভাবেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্মের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয়
জাতীয়তাবাদের উন্মেশ ঘটে। ইংরেজ হিউম প্রতিষ্ঠাতা হলেও বাঙালী উমেশ
ব্যানার্জী কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি। বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায়,
দাদাভাই নওরোজী, বিপীন চন্দ্র পাল প্রমুখ নেতা দলটির অন্যতম দিকপালে
পরিণত হন।
কংগ্রেসের লক্ষ ও উদ্দেশ্য বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে ১৯০৫-১৯০৬ সালে দু’টো
দাবিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে এবং তা ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতালাভের
পূর্বকাল পর্যন্ত চলতে থাকে। এক, স্বরাজ লাভ দুই, পূর্ণ স্বাধীনতা।
বাল গঙ্গাধর তিলক ঘোষণা করেন “স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার, আর তা আমাকে
পেতেই হবে।” দাদাভাই
নওরোজীও একই সুরে বলেন,”স্বরাজ অর্জনই কংগ্রেসের কর্মধারার মূল লক্ষ। ”
পরবর্তীতে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও স্বরাজের দাবিতে অহিংস অসহযোগ
আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯২৮ সালে কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণ স্বাধীনতার
দাবি করে।
এ সময় স্যার চিত্তরঞ্জন দাশ, গোপাল কৃষ্ণ গোখলে, সীতারামাইয়া, সরোজিনী
নাইডু, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, পন্ডিত জওহরলাল
নেহেরুর ন্যায় স্বাধীনতাকামী নেতাদের অভ্যুদয় ঘটে। ফলে কংগ্রেসের
নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসাবে
স্বাধীনতা অর্জন করে।

“বোধদয়”

স্যার সৈয়দ আহমদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মুসলমানরা ইংরেজী শিক্ষায় ক্রমে
শিক্ষিত হয়ে উঠলেও তারা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করে, যে ভারতবর্ষে
হিন্দু মুসলমান দুটি আলাদা ও স্বতন্ত্র সম্প্রদায়।
আই, এইচ কোরশী তার বিখ্যাত গ্রন্থ History of the Freedom Movement,-এ
যথার্থই লিখেছেন,” To many Hindus, nationalism and Hindu communalism
became twin sisters.”
অ্যালেন অক্টেভিয়ান হিউম লিখেছেন, ভারতে বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে স্যার
সৈয়দ আহম্মদ খানের পুস্তক পড়ার পরেই সর্বপ্রথম আমি অনুভব করি যে, ভারতীয়
জনমতের মঞ্চস্বরূপ একটা সংগঠন প্রয়োজন। আর এই প্রয়োজনের প্রেক্ষিতেই আমি
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম দেই।”
অবশ্য, ১৮৩৩ সালে কলকাতায় সুরেন্দ্রনানাথ ব্যানার্জী ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন
নামে প্রথম একটি প্লাটফর্ম দাঁড় করিয়ে সকল ভারতীয়কে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান
জানান। বোম্বাই, মাদ্রাজ ও বাংলা প্রেসিডেন্সিতে একই নামে সংগঠন গড়ে
উঠেছিল।
োোোোোোোোোোোোোোোোস্যার সৈয়দ আহমদের মৃত্যুর পর আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে
শিক্ষা প্রাপ্তরা মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নটি সামনে
নিয়ে আসেন। ১৯০১ সালের ২১ অক্টোবর লক্ষ্মৌতে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ব্যারিস্টার সৈয়দ শরফুদ্দীনের সভাপতিত্বে।
স্যার সৈয়দ আহমদের বন্ধু নওয়াব ভিকারুল মুলক্ এগিয়ে আসেন।
১৯০৬ সালের অক্টোবরে মহামান্য আগা খানের নেতৃত্বে বড় লাট লর্ড মিন্টোর
সঙ্গে সিমলায় সাক্ষাত করেন এবং মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন দাবি করেন।
বিস্ময় যে, ১৪ লাখ ৬১ হাজার ১৮৩ জন সদস্য প্রতিনিধি দলে ছিলেন।।
ঢাকায় সর্ব ভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯০৬ সালের ৩০
ডিসেম্বর। নবাব ভিকারুল মুলক্ ভাষণ দেয়ার পর নবাব স্যার সলিমুল্লাহ নিখিল
ভারত মুসলিম লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
আগা খান সভাপতি এবং নবাব ভিকারুল মুলক্ ও নবাব মোহসীন উল মুলক্
যুগ্মভাবে সম্পাদক হন।
১৯০৭ সালে ডিসেম্বর করাচীতে প্রথম সম্মেলনে বোম্বাই এর স্যার আদমজী
পীরভাই গঠনতন্ত্র পেশ করে তা অনুমোদন করিয়ে নেন।

“মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাতা”

মহামান্য আগা খান, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, ভিকার উল মুলক্, মোহসীন উল
মুলক্, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, লাহোরের শাহ্ দীন, হাকিম আজমল খান,
মওলানা জাফর আলী খান, মওলানা মোহাম্মদ আলী, মওলানা শওকত আলী ও
বোম্বাইয়ের স্যার আদমজী পীরভাই, সৈয়দ আমির আলী প্রমুখ।
লর্ড মিন্টোর আগে লর্ড কার্জন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বঙ্গভঙ্গ আইন পাস
করি বাংলা প্রেসিডেন্সি ভেঙ্গে ফেলেন। পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে একটি এবং
পশ্চিমবঙ্গ নামে আরেকটিটি প্রদেশ হলে মুসলিম লীগ তাকে স্বাগত জানায়।
সর্বভারতীয় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যেমন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিম লীগকে
নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীন পাকিস্তানের অভ্যুদয় ঘটিয়েছেন, ঠিক তেমনি মুসলিম
লীগ থেকে বেরিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটান।

“পাকিস্তানভিত্তিক
আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন”

পাকিস্তান গণপরিষদ এবং মুসলিম লীগ থেকে বহিস্কৃত হওয়ার জের ধরে হোসেন
শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশনায় উভয় অঞ্চলে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা
করা হয়।

প্রথমে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার ঐতিহাসিক রোজগার্ডেনে পূর্বপাকিস্তান
আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং ১৯৫০ সালের ১৩ জুলাই করাচীতে নিখিল পাকিস্তান
আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে দলটি আত্মপ্রকাশ করে, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত
পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের তীব্র বাঁধা-বিপত্তির মুখে।
অবশ্য,দল-প্রতিষ্ঠার নির্দেশনাদানকারী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকার
কর্মীসম্মেলনে উপস্থিত থাকতে পারেননি। নুরুল আমীন সরকার কর্তৃক
পূর্বপাকিস্তানে প্রবেশের ওপর তাঁর নিষেদ্ধাজ্ঞা আরোপিত হওয়ায়।
নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি পদে হোসেন শহীদ
সোহরাওয়ার্দী এবং সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত করা হয় অবাঙালী মাহমুদ
আলী ওসমানীকে।

“পূর্ববাংলা বা পূর্ববঙ্গ এর স্থলে প্রদেশের নাম
পূর্বপাকিস্তান যে কারণে”

সোহরাওয়ার্দী সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা থেকে পূর্ববাংলা বা পূর্ববঙ্গ
নয়, বিভক্ত বাংলার পূর্বাঞ্চলের নাম “পূর্বপাকিস্তান” রাখেন।
নেপথ্যে মূলত, তিনি “পাকিস্তান জাতীয়তাবাদ” প্রবর্তনের আগাম পরিকল্পনা
ব্যক্ত করেন।
কেননা, পাকিস্তান প্রস্তাবক শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গণপরিষদ সদস্য কেড়ে নেয়া
হয় এ বক্তব্যের জের ধরে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান “সোহরাওয়ার্দীকে
অভিহিত করেন পাকিস্তানের দুশমন ও ভারতের লেলিয়ে দেয়া কুকুর” বলে।
পাকিস্তান প্রবর্তক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত
পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের অধিবেশনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দেয়া ওই
প্রস্তাবের মূলে ছিল, জাতীয়তাবাদী চেতনায় স্বাধীন পাকিস্তানকে সকল
ধর্ম-বর্ণের মানুষের উপযোগী স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলা।
গণপরিষদে দেয়া প্রস্তাবে মুসলিম লীগের নাম পাল্টে “জাতীয়তাবাদী লীগ” বা
“জাতীয় লীগ” নামকরণের প্রস্তাব দেন এ পাকিস্তান প্রস্তাবক।

“পাকিস্তান জাতীয়তাবাদ”

১৯৫৪ সালে গভর্নর জেনারেল গোলাম মহম্মদের অনুরোধে কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রী
হওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করেন।
১৯৫৬ সালে গভর্নর জেনারেল জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জার আহবানে
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ করে শাসনতন্ত্রে “এক ইউনিট” পন্থা
গ্রহণ করে তাঁর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার বাস্তবায়নও ঘটান।
তিনি সিন্ধু, বেলুচিস্তান, পশ্চিম পাঞ্জাব প্রদেশকে “পশ্চিম পাকিস্তান”
প্রদেশে পরিণত করেন।
তাঁর নির্দেশনায় এসময় পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামেও একটি দল
গঠন করা হয়। যা বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর অস্তিত্ব হারায়।

“আওয়ামী মুসলিম লীগের
গঠন প্রক্রিয়া”

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী টাঙ্গাইলের অধিবাসী হলেও আসামের
রাজনীতির পুরোধা ছিলেন।
সর্বশেষ তিনি আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি পদে আসীন ছিলেন।
পূর্ববঙ্গের বা পশ্চিম বঙ্গের রাজনীতিতে তাঁর পরিচিতি ছিল না।
দেশ বিভাগের পর আসাম ভারতের প্রদেশে পরিণত হলে বিপাকে পড়েন ভাসানী।
আসামের এক কৃষক আন্দালনে নেতৃত্ব দিয়ে সফল হলে ভাসানচরের মানুষ তাঁকে
“ভাসানী” উপাধী দেয়। কিন্তু আসামের উপাধীকে বহন করে তাঁকে আসাম ছেড়ে
পূর্ববাংলায় চলে আসতে হয়।
“বাঙ্গাল খেদাও” আন্দোলনের তোপে পড়ে ভাসানীকে গ্রেফতারবরণ করতে হয় এবং
আসামের ধুবড়ী জেল থেকে মুক্তি পেয়ে টাঙ্গাইলে নিবাস গড়ে তোলেন।
ঠিক এই সময় একজন সদস্যের মৃত্যুতে টাঙ্গাইল দক্ষিণ আসনটি শূন্য হয়।
তখন উপনির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থী জমিদার হুমায়ুন খান পন্নীর বিরুদ্ধে
মওলানা ভাসানী নির্দলীয় প্রার্থী হন।
তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেও সরকার ফলাফল বাতিল করে।
১৯৫০ সাল পর্যন্ত তাঁকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
আবার উপনির্বাচন দিলে এবার ১৫০ মোগলটুলীর মুসলিম লীগ কর্মীরা শামসুল হককে
হুমাযুন খান পন্নীর বিরুদ্ধে প্রার্থী করে।
শেখ মুজিবুর রহমানসহ কলকাতা ফেরত ছাত্রলীগ নেতাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের
ফলে শামসুল হক বিজয়ী হন। কিন্তু এই ফলাফল বাতিল ঘোষিত হয়।

“মূল দাবী” প্রস্তাবই হলো
দলের ম্যানিফেষ্টো”

২৩ জুনের ঢাকার রোজগার্ডেনে মুসলিম লীগ কর্মীসম্মেলনে “মূল দাবি” নামে
একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন টাঙ্গাইলের শামসুল হক। মূল দাবি প্রস্তাবের
অনুমোদনের মাধ্যমে পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ আনুষ্ঠানিক
আত্মপ্রকাশ করে।
আবুল হাশিম নিখিল বঙ্গ মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম এই দলের
সঙ্গে যুক্ত না হলেও তাঁর ১৫০ মোগলটুলী ক্যাম্পের সমর্থনপুষ্টরাও আওয়ামী
মুসলিম লীগ গঠনের নেপথ্য বিরাট ভুমিকা রাখেন।
সয়ং কর্মীসম্মেলনে ঘোষিত দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক আবুল হাশিমপন্থী
বলে পরিচিত ছিলেন। নিখিল বঙ্গ মুসলিম লীগের সভাপতি হোসেন শহীদ
সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবুল হাশিম।
তিনি সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মতবিরোধের কারণে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের
সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তবে তিনি না থাকলেও তাঁর অনুসারীরা অধিকাংশই
আওয়ামী মুসলিম লীগে শামিল হন।

“মুসলিম লীগের দরজা বন্ধ”

সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলার সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীই শুধু নন, নিখিল
বঙ্গ মুসলিম লীগের সভাপতিও ছিলেন। তাঁকে সরিয়ে মওলানা আকরম খানকে সভাপতি
করা হয়। আর মুখ্যমন্ত্রী হন খাজা নাজিমুদ্দিন। ফলে সোহরাওয়ার্দী
পন্থীদের জন্য মুসলিম লীগের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ
আলী জিন্নাহর মৃর্ত্যুর পর সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। পাঞ্জাবের এককালীন
মুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী খলিকুজ্জামান নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের সভাপতি
হন।
পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন জিন্নাহর স্থলে পাকিস্তানের
গভর্নর জেনারেল পদে আসীন হন। পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেন নুরুল
আমীন। ফলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি টালমাটাল হয়ে পড়ে।
উর্দু হবে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা পাকিস্তানী শাসকদের এই হুঙ্কারে
পূর্বপাকিস্তানে ছাত্রসমাজ গর্জে ওঠে। শেরেবাংলা, মওলানা ভাসানী,মওলানা
তর্কবাগীশ, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, মহিউদ্দীন আহমেদ, তাজউদ্দীন
আহমেদ, অলি আহাদ, গাজীউল হকসহ সর্বমহল মাতৃভাষা বাংলা চাই দাবিতে
সোচ্চার হয়ে ওঠে। গঠিত হয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদ।

“ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা”

ভাষা সংগ্রাম সূচনার আগেই নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে একটি
গ্রুপ ছিল খাজা নাজিমুদ্দিন পন্থী, যার নেতৃত্বে ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান
এবং অন্যটি ছিল সোহরাওয়ার্দী পন্থী, যার নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুজিবুর
রহমান। শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন উপদলটি ১৯৪৮ সালের চার জানুয়ারি থাকা
বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক মুসলিম হল মিলনায়তনে মিলিত হয়ে “পূর্বপাকিস্তান
মুসলিম ছাত্রলীগ” নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটায়। এবং ভাষা সংগ্রামে
অগ্রণী ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়। শেখ মুজিবসহ ছাত্রলীগ নেতারা কারারুদ্ধ হলে
জনমত তাদের পক্ষে যায়।

ধীরে ধীরে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের পকেট সংগঠনে পরিণত হওয়ায় অচিরেই শাহ
আজিজুর রহমান ও শামসুল হুদা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন নিখিল পাকিস্তান মুসলিম
ছাত্রলীগ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। সোহরাওয়ার্দী পন্থীরা মুসলিম লীগের
সদস্যপদ লাভের জন্য প্রথমে মওলানা আকরম খান ও পরবর্তীতে করাচীতে গিয়ে
আনোয়ারা খাতুন এমএলএ ও আতাউর রহমান খান চৌধুরী খলিকুজ্জামানের দ্বারস্থ
হয়েও বিমুখ হয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন।
ভক্তানুসারীদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সোহরাওয়ার্দী করাচী থেকে ঢাকায় আসার
উদ্যোগ নেন। স্টিমারযোগে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছলে ওখান থেকেই সংশ্লিষ্ট
কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রের নির্দেশনামা প্রদর্শন করে তাঁকে পূর্ববাংলায়
নিষিদ্ধ ঘোষিত করেন।
১৯৪৯ সালের ৯ জুন সোহরাওয়ার্দী আবার ঢাকায় আসেন। ছাত্রলীগের অস্থায়ী
আহবায়ক দবিরুল ইসলামের হেবিয়ার্স কর্পাস মামলা পরিচালনার জন্য।
এরপর ভারত বিভাগপূর্ব আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের পদচ্যুত সভাপতি
মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সামনে রেখে দলগঠনের আনুষ্ঠানিক
প্রক্রিয়া শুরু হয়।

“রোজগার্ডেন”

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন
অনুষ্ঠিত হয়। ১৫০ মোগলটুলী মুসলিম লীগ ক্যাম্পের সোহরাওয়ার্দী ও আবুল
হাশিম পন্থী কর্মীরাই মূলত মূল শক্তিরূপে আবির্ভূত হন। কর্মীসম্মেলনটি
শুরু হয় মওলানা রাগীব আহসানের কন্ঠে পবিত্র কোরআনের বানী তেলওয়াতের মধ্য
দিয়ে। মূল দাবি শিরোনামে শামসুল হক যে প্রস্তাবটি সম্মেলনে উত্থাপন
করেন, সেটাই পাস হয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের মেনিফ্যাস্টোরূপে গৃহীত হয়।
দলগঠনের অন্যতম কান্ডারী ও ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান
কারাগারে থেকেই এর প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেন।

চলবে ………………….. ।

 বরিশাল ক্রাইম নিউজ ডট কম

আ”লীগের ঘোষণাপত্রেও ইতিহাস বিকৃতি

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৭ ৭:৪৬ অপরাহ্ণ

সোহেল সানি // বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ করে আসছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু এর নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগেও যে ইতিহাস বিকৃতির ঘটেছে, সে অভিযোগ করবে কে?আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সংশোধিত ম্যানিফেষ্টোতে বর্ণিত দলপ্রতিষ্ঠার ইতিকথায় বিশেষ করে উদ্যোক্তাকারী নেতৃবর্গ এবং তাঁদের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বর্ণিত ব্যাখ্যা চরম বিকৃতিসুলভ। আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র বা ম্যানিফেষ্টোটির শব্দকোষেই রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ মুক্তির সংগ্রামে একটি নিয়মাতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের ভুমিকায়
অবতীর্ণ হয়ে গৌরববর্ধন করলেও পরিতাপের বিষয় যে তার ঘোষণাপত্রে ব্যবহৃত
শব্দগুচ্ছো একেবারেই বৈপ্লবিক। যেন লেলিলবাদ, মার্কসবাদী কিংবা মাওবাদ
দলটির আদর্শ এবং তা প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্পে বিভোর।
এর কারণ ঊদঘাটন করতে গিয়ে প্রমাণিত এক সত্য উঁকি দিচ্ছে যে আওয়ামী লীগের
ঘোষণাপত্রটির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে চীনপন্থী মওলানা ভাসানীর ন্যাপ
নেতাদের নেতৃত্বে। অধ্যাপক আবু সাইয়িদের পর আসাদুজ্জামান নূর ও নূহ্ উল
আলম লেলিন প্রচার ও প্রকাশণা সম্পাদকের দায়িত্বপালন করেন। এই সময়ে
ঘোষণাপত্রের ভাষাব্যবহারে দেয়া হয় বৈপ্লবিক রূপ এবং নেতৃত্বের বর্ণনায়
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নাম ও অবস্থান মওলানা আব্দুল হামিদ খান
ভাসানীর নীচে নামিয়ে আনা হয়েছে। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের সাড়াজাগানো
কাউন্সিল সভামঞ্চ ও ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রঙবেরঙে সজ্জিত
তোরণচিত্রে সোহরাওয়ার্দীর প্রতিকৃতির আগে শোভা পেয়েছে ভাসানীর
প্রতিকৃতি। প্রথম সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের কথা যেন না পেরে উল্লেখ
করা হয়েছে। আর কেন্দ্রীয় পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক
মাহমুদুল হক ওসমানীর নাম দেয়া তো পরের কথা।
অথচ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে মওলানা ভাসানীও তাঁর নেতা হিসাবে মেনে
নিয়েছিলেন। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অল পাকিস্তান আওয়ামী
লীগের সভাপতি। আর ভাসানী ছিলেন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগ শাখার সভাপতি।
পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নামেও একটি প্রাদেশিক শাখা ছিল।
এসবের কিছুই উল্লেখ নেই আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে। ঐতিহাসিক
যুক্তফ্রন্টের পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নেতা হিসাবে শেরেবাংলা
এ কে ফজলুল হককে আওয়ামী লীগ পূর্বপাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী পদে মেনে
নিয়েছিল, আবার কৃষক শ্রমিক পার্টির নেতা শেরেবাংলাও পাকিস্তান কেন্দ্রীয়
জাতীয় পরিষদ নেতা হিসাবে সোহরাওয়ার্দীকে মেনে নিয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রটি সমৃদ্ধ হতো যদি সোহরাওয়ার্দীর
প্রধানমন্ত্রীত্বে আওয়ামী লীগের দেড় বছর ধরে সারা পাকিস্তান শাসনের কথা
যদি উল্লেখ থাকতো। যদি থাকতো সেই সরকারের দুই প্রদেশের বাঘা বাঘা সেই সব
মন্ত্রীদের নাম। পাশাপাশি বর্ণিত হতে পারতো পাকিস্তানের অধ্যায়ে
কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সরকারের ও পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগ সরকারের
সাফল্যগাঁথা।
‘০২ সালের কাউন্সিল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র যতটুকু অবিকৃত ছিল,
তা কেটেছেঁটে বামপন্থী দুই নেতা আসাদুজ্জামান নূর ও নূহ্ উল আলম লেলিন
এমন অবস্থায় রূপ দিয়েছেন, যা কেবল বিকৃতিগ্রস্ত। সাবেক ছাত্রইউনিয়ন নেতা
অভিনেতা নূর এখন আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রী। অপর ছাত্রইউনিয়ন
নেতা লেলিন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামে ঠাঁই পেলেও বিগত কাউন্সিলে বাদ
পড়েছেন।

ইতিহাস বিকৃতির সূচনা বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়েই শুরু।
আওয়ামী লীগের এমন অভিযোগকে রাষ্ট্রযন্ত্র উপেক্ষা করে চললেও প্রগতিবাদী
গোষ্ঠীদলের কন্ঠ ইতিহাস বিকৃতিকারী প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রশক্তির রাশ
টেনে ধরার পক্ষেই ছিল, এবং আছে। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী
লীগের ইতিহাসেও যে চরম বিকৃতি ঘটেছে। তা দেখার কেউ আছে বলে মনে হয় না।
দলটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রী শেখ আব্দুল আজিজ
ছাড়া কেউ নেই। একেক করে সবাই চলে গেছেন পরলোকে। আওয়ামী লীগের ইতিহাস
লেখার অদম্য ইচ্ছা থেকে দুই যুগ গবেষণার পর একটা ইতিকথা লেখার ধৃষ্টতা
পোষণ করছি। যা ইতিহাস বিকৃতিরোধে কিছুটা হলেও প্রভাব রাখতে পারলে আমার এ
মহৎ প্রচেষ্টা সার্থক হবে।

“আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম ঘোষণাপত্রে যা বলা হয়েছিল”

“ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ্ কেবল মুসলমানের নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ
নির্বিশেষে সমগ্র মানবের। মানবতার চূড়ান্ত মুক্তিসংগ্রাম যাতে বিলম্বিত
না হয়, সেজন্য জনতাকে তাহাদের সমস্ত ব্যক্তিগত এবং দলগত বিভেদ বিসর্জন
দিয়া এককাতারে সমবেত হইতেই মুসলিম লীগ কর্মীসম্মেলন আবেদন জানাইতেছে।”
১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার স্বামীবাগস্থ বিখ্যাত রোজগার্ডেনে
অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কর্মীসম্মেলন থেকে “আওয়ামী মুসলিম লীগ” নামে একটি
দল গঠনের ঘোষণা দিয়ে এই আহবান জানানো হয়।
উপস্থিত তিন শতাধিক কর্মীসমর্থক অকুন্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে নতুন দল গঠনের
সিদ্ধান্তকে করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানায়।
সারা পাকিস্তানভিত্তিক একটি কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কাঠামো গঠনের আগাম
চিন্তাভাবনার অংশ হিসাবে প্রথমে পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ
প্রতিষ্ঠা করা হয়। মূল পরিকল্পনাকারী শুধু নয়, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীই
হলেন দলটির নেপথ্যবিধানদাতা।

“নেতৃবর্গের মধ্যে যোগসূত্র”

১৯৪৯ সালের ৯ জুন ঢাকায় এসে তাঁর বেশ কিছু ভক্তানুসারীসহ দেশবিভাগপূর্ব
আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর
সঙ্গে শলাপরামর্শ করেন। চারদিনের মাথায় ভাসানীকে আহবায়ক ও ইয়ার মোহাম্মদ
খানকে সদস্যসচিব করে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা
হয়।
এরপর রোজগার্ডেন থেকে পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম
প্রচারিত হবার পর সভাপতি হিসাবে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নাম
ঘোষণা করেন আতাউর রহমান খান।
মওলানা ভাসানী সহসভাপতি পদে আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হোসেন, আলী
আহম্মদ খান, আলী আমজাদ খান, আব্দুস সালাম খান, সাধারণ সম্পাদক পদে
শামসুল হক ও যুগ্মসম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, সহ
যুগ্মসম্পাদক পদে একে রফিকুল হোসেন এবং কোষাধ্যক্ষ পদে ইয়ার মোহাম্মদ
খানের নাম ঘোষণা করেন। এরপর শামসুল হক জানান, সভাপতি মহোদয় ৪০ সদস্য
বিশিষ্ট কমিটির বাদবাকী পদে মনোনীত করে তা ঘোষণা করবেন।

“বলা বাহুল্য”

আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্য শুধুমাত্র সদস্যদের একটি তালিকা চূড়ান্তকরণ
হলেও তা কখনও আলোর মুখ দেখেনি।
এমনকি অফিস পরিচালনার জন্য একটি দফতর সম্পাদকের পদও তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
মওলাননা ভাসানী শামসুল হকের আগেই শেখ মুজিব ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি
কারামুক্ত হয়ে ৯০ নম্বর নবাবপুরস্থ বাড়ির একটি কক্ষে দুটো চেয়ার, দুটো
টুল ও একটি টেবিল নিয়ে অফিস খুলে বসেন। মোহাম্মদুল্লাহ নামের এক তরুণ
উকিল স্বেচ্ছায় কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করলে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক
শেখ মুজিব তাকে দপ্তরের কাজে বসিয়ে দেন। ১৯৫৩ সালের প্রথম কাউন্সিলে শেখ
মুজিব সাধারণ সম্পাদক হয়ে মোহাম্মুদুল্লাহকে দপ্তর সম্পাদক নিয়োগ দেন।
১৯৭২ সাল পর্যন্ত মোহামুদুল্লাহ এই পদে ছিলেন। পরে স্পিকার,রাষ্ট্রপতি
করা হলেও শেখ মুজিব হত্যার পর খুনী মোশতাকের উপরাষ্ট্রপতি এবং বিএনপিতে
যোগ দিয়ে বিচারপতি সাত্তারেরও দুদিনের জন্য উপরাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন।
উল্লেখ্য প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন, আলী আমজাদ খান ও
সহযুগ্মসম্পাদক একে রফিকুল হোসেন ১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবর কর্মসূচিপালন
কালে ভাসানী ও শামসুল হক গ্রেফতার হবার পর আতঙ্কিত হয়ে পত্রিকায় বিবৃতি
দিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। শেখ মুজিবের
গ্রেফতারের পর অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক খন্দকার মোশতাক দলের থেকে দূরে সরে
যান।
ফলে ১৯৫৩ সালের প্রথম কাউন্সিলেই কমিটি থেকে বাদ পড়েন তিনি। ১৯৫৪ সালের
মনোনয়ন না পেয়ে মোশতাক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে দাউদকান্দি থেকে জয়ী
হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে শেরেবাংলার
যুক্তফ্রন্টে থাকার কারণে বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিস্কার হন মোশতাক।
১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দ রদ হলে আরেক বহিস্কৃত সহসভাপতি আব্দুস সালাম
খানের সঙ্গে এক হয়ে মোশতাক আওয়ামী মুসলিম লীগ নামেই একটি দলের নাম
টিকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করেন।

“যুগ্ম সম্পাদকের পদ বিলুপ্ত”

আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলেই যুগ্মসম্পাদকের পদ বিলুপ্ত করা হয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যাত্তোর এই পদ পুনরায় সৃষ্টি করা হয়। ১৯৫৩ সালের কাউন্সিলে
সাংগঠনিক, প্রচার ও শ্রম, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদ সৃষ্টি করে তাতে নিয়োগ
দেয়া হয় যথাক্রমে এম কোরবান আলী, আব্দুর রহমান, আব্দুস সামাদ আজাদ ও
তাজউদ্দীন আহমেদকে। সমর্থন করেন। গ্রহণ করেন।

“কেন্দ্রীয় আওয়ামী
মুসলিম লীগ গঠন”

পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় রাজধানী
করাচীতে কেন্দ্রীয় দল গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এজন্য ১৯৫০ সালের ১৩ জুলাই বিভিন্ন প্রদেশের নেতাদের এক ‘প্রতিনিধি
সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। আর এ মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে “নিখিল পাকিস্তান
আওয়ামী মুসলিম লীগ।” নেতৃত্ব গ্রহণ করেন সয়ং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
১৯৫৫ সালে “মুসলিম” শব্দটটি পরিহার করে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে তুলতে
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য দলের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। সেই
থেকে আজ পর্যন্ত “আওয়ামী লীগ” নামে পরিচিত হয়ে আসছে।

“পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগ”

১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন সারা পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় তখন গঠন করা
হয় পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগ।

“আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ভাঙ্গন”

১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগে চরম ভাঙ্গণ দেখা দেয়। যখন কেন্দ্রে ও প্রদেশে
শাসন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। সেটা ছিল দেড় বছরের শাসনামল। পাকিস্তানের
প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর মার্কিন ঘেঁষা বৈদেশিক নীতির বিরুদ্ধে
আওয়ামী লীগে মতবিরোধ দেখা দেয়। পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা
ভাসানীসহ তাঁর অনুসারীরা কাগমারীতে দলের কাউন্সিল করেন।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অবাঙালী মাহমুদুল হক ওসমানী
নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান করেন। মওলানা ভাসানীর “ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি
(ন্যাপ) প্রতিষ্ঠা করে কেন্দ্র ও প্রদেশের সভাপতি হন। কেন্দ্রীয় সাধারণ
সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন যথাক্রমে মাহমুদুল হক ওসমানী ও মাহমুদ আলী।
আওয়ামী লীগ দলের সভাপতির শূন্য পদে মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশকে
মনোনীত করে।

“শামসুল হকের মস্তিষ্কে বিকৃতি”

আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হলেও কার্যত শামসুল হক
কারারুদ্ধ হয়ে পড়েন। যে কারণে তিনি সাংগঠনিক পরিসরে কর্মকান্ড পরিচালনা
করতে পারেননি।
১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবর দলের দ্বিতীয় কর্মসূচি পালনকালে গ্রেফতার হন
মওলানা ভাসানীর সঙ্গেই। যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ওদিন গ্রেফতার
এড়াতে সফল হলেও করাচী থেকে আসার পর গ্রেফতার হয়ে যান।
১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারী তিনি মুক্তি পেলেও ভাসানী-শামসুল হক কারাগারেই
থাকেন। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ হিসাবে শেখ মুজিবকেই দায়িত্বপালন করে যেতে হয়।
শামসুল হক কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েন। কারারুদ্ধ
অবস্থায় আচার আচারণে বিকৃতি ও দিনরাত জিকির করার খবর ছড়িয়ে পড়ে।
এ কথা শুনে তাঁর সুন্দরী স্ত্রী অধ্যাপিকা আফিয়া খাতুন লন্ডন প্রবাসী এক
অবাঙালীকে বিয়ে করে সেখানে সংসার পাতেন। এ খবরশুনে শামসুল হক একরকম
পাগলবনে। আফিয়া খাতুন ছিলেন তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী। বিয়েটা
ছিল প্রেমের পরিণতি।
কারাগার থেকে শামসুল হক পান। ১৯৫৩ সালে ঢাকা সিটি আওয়ামী মুসলিম লীগের
প্রথম কাউন্সিলে শামসুল হককেই প্রধান অতিথি করা হয়। কিন্তু তাঁর
আচার-আচারণে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সভামঞ্চে। তিনি তাঁর
বক্তৃতায় নিজেকে সারা দুনিয়ার “খলিফা” বলে দাবি করে বসেন।
শামসুল হকের আশা এবার ছেড়ে দেয় দলটি। তিনি একসময় লাপাত্তা হয়ে সবার অলক্ষে চলে যান।
এভাবেই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে প্রতিভাবান এ নেতা চিরদিনের
জন্য অন্তর্ধান হয়ে যান। করুণতরভাবে রাজনীতিতে যবনিকাপাত ঘটে সম্ভাবনাময়
শামসুল হক অধ্যায়ের।

“শেখ মুজিবের উত্থান শুরু”

১৯৫৩ সালের প্রথম প্রাদেশিক কাউন্সিলে ভারপ্রাপ্ত থেকে শেখ মুজিবুর
রহমান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে অপ্রতিরোধ্য
হয়ে ওঠেন।
১৯৫৫ সালে আতাউর রহমান খানের মন্ত্রী পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। দলীয়
গঠনতন্ত্রে একই সঙ্গে মন্ত্রীত্ব ও নেতৃত্ব করার বিষয়ে বিধি নিষেধ থাকায়
প্রশ্ন ওঠায় এ পন্থা অবলম্বন করেন তিনি।
১৯৬৫ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে সোহরাওয়ার্দীর রহস্যজনক মৃত্যুতে রাজনীতির
দৃশ্যপট বদলে যায়।
শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন দলের কান্ডারী। ১৯৬৬ সালে প্রদেশের সভাপতি পদ গ্রহণ
করেন এবং সাধারণ সম্পাদক করেন তাজউদ্দীন আহমেদকে।
তখনও নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে নওয়াবজাদা নসুরউল্লাহ খান
ও সাধারণ সম্পাদক পদে জহিরুদ্দীন।
১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফাকে কেন্দ্র করে জেনারেল আইয়ুব খান আগরতলা
ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসাতে চান শেখ মুজিবকে। ফলে তিনি অবিসংবাদী নেতায়
পরিনত হন। ১৯৬৯ এর ছাত্রসমাজের গণঅভ্যুত্থান তাঁকে এনে দেয় “বঙ্গবন্ধু”
খেতাব।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আওয়ামী লীগেরও
সভাপতির পদ অলংকৃত করেন।
সাধারণ সম্পাদক করা হয় এএইচএম কামরুজ্জামানকে। নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি
পাকিস্তানের রাজনীতিতে “কিংবদন্তী” হয়ে ওঠেন। পাকিস্তানের
প্রধানমন্ত্রীত্ব হাতের মুঠঠোয় থেকে খসে যায় সামরিক জান্তা জেনারেল
ইয়াহিয়া ও নির্বাচনে সংখ্যালঘু দল পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টোর
ষড়যন্ত্রের কারণে।

১৯৭১

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ নেতৃত্বদানকারী সংগঠন হিসাবে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ
পরিনত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে। বঙ্গবন্ধু থেকে তিনি বাংলাদেশের
স্বাধীনতার স্থপতি হিসাবে হয়ে ওঠেন “জাতির পিতা।”

“জন্মসূত্র”

ভারত উপমহাদেশে শতশত দল গঠিত হলেও স্বাধীনতার পতাকাবাহী প্রধান দল
তিনটি। একটি দলের প্রতিষ্ঠার সূত্র ধরে ঐতিহাসিক মুক্তিসংগ্রামের জন্য
তিনটি দলের অভ্যুদয়। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লী।
কংগ্রস প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেন অক্টেভিয়ান হিউম ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি উমেশ ব্যানার্জী।
মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা মহামান্য আগা খান ও প্রস্তাবক নবাব স্যার সলিমুল্লাহ।
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও প্রস্তাবক মওলানা
আব্দুল হামিদ খান ভাসানী।
১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় কংগ্রেস,১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ
ও ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ জন্মলাভ করে।

রাজনৈতিক সূত্র
“কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা”

১৮৮৪ সালের মধ্যবর্তীকালীন উচ্চপদস্থ ইংরেজ আমলাঅ্যালান অক্টোভিয়াম হিউম
দেশের মানুষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি এক
খোলা চিঠির মারফত ভারতীয়দের নৈতিক, মানসিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জাগরণের
লক্ষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের একটি সমিতি গঠনের আহবান
জানান।
লর্ড রিপনের শাসনামলে ১৮৮৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর “ভারতীয় জাতীয় ইউনিয়ন
(ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ইউনিয়ন) নামে একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে।
এরপর এ ব্যানারেই ১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বাইতে সর্ব ভারতীয়
প্রতিনিধিদের এক কংগ্রেস আহবান করা হয়।
সম্মেলনের সিদ্ধান্তক্রমে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ইউনিয়েনের নাম ঈশৎ পরিবর্তন
করে “ইউনিয়ন” শব্দটটি তুলে দিয়ে “কংগ্রস” শব্দটি স্থাপন করা হয়।
এভাবেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্মের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয়
জাতীয়তাবাদের উন্মেশ ঘটে। ইংরেজ হিউম প্রতিষ্ঠাতা হলেও বাঙালী উমেশ
ব্যানার্জী কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি। বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায়,
দাদাভাই নওরোজী, বিপীন চন্দ্র পাল প্রমুখ নেতা দলটির অন্যতম দিকপালে
পরিণত হন।
কংগ্রেসের লক্ষ ও উদ্দেশ্য বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে ১৯০৫-১৯০৬ সালে দু’টো
দাবিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে এবং তা ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতালাভের
পূর্বকাল পর্যন্ত চলতে থাকে। এক, স্বরাজ লাভ দুই, পূর্ণ স্বাধীনতা।
বাল গঙ্গাধর তিলক ঘোষণা করেন “স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার, আর তা আমাকে
পেতেই হবে।” দাদাভাই
নওরোজীও একই সুরে বলেন,”স্বরাজ অর্জনই কংগ্রেসের কর্মধারার মূল লক্ষ। ”
পরবর্তীতে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও স্বরাজের দাবিতে অহিংস অসহযোগ
আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯২৮ সালে কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণ স্বাধীনতার
দাবি করে।
এ সময় স্যার চিত্তরঞ্জন দাশ, গোপাল কৃষ্ণ গোখলে, সীতারামাইয়া, সরোজিনী
নাইডু, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, পন্ডিত জওহরলাল
নেহেরুর ন্যায় স্বাধীনতাকামী নেতাদের অভ্যুদয় ঘটে। ফলে কংগ্রেসের
নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসাবে
স্বাধীনতা অর্জন করে।

“বোধদয়”

স্যার সৈয়দ আহমদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মুসলমানরা ইংরেজী শিক্ষায় ক্রমে
শিক্ষিত হয়ে উঠলেও তারা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করে, যে ভারতবর্ষে
হিন্দু মুসলমান দুটি আলাদা ও স্বতন্ত্র সম্প্রদায়।
আই, এইচ কোরশী তার বিখ্যাত গ্রন্থ History of the Freedom Movement,-এ
যথার্থই লিখেছেন,” To many Hindus, nationalism and Hindu communalism
became twin sisters.”
অ্যালেন অক্টেভিয়ান হিউম লিখেছেন, ভারতে বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে স্যার
সৈয়দ আহম্মদ খানের পুস্তক পড়ার পরেই সর্বপ্রথম আমি অনুভব করি যে, ভারতীয়
জনমতের মঞ্চস্বরূপ একটা সংগঠন প্রয়োজন। আর এই প্রয়োজনের প্রেক্ষিতেই আমি
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম দেই।”
অবশ্য, ১৮৩৩ সালে কলকাতায় সুরেন্দ্রনানাথ ব্যানার্জী ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন
নামে প্রথম একটি প্লাটফর্ম দাঁড় করিয়ে সকল ভারতীয়কে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান
জানান। বোম্বাই, মাদ্রাজ ও বাংলা প্রেসিডেন্সিতে একই নামে সংগঠন গড়ে
উঠেছিল।
োোোোোোোোোোোোোোোোস্যার সৈয়দ আহমদের মৃত্যুর পর আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে
শিক্ষা প্রাপ্তরা মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নটি সামনে
নিয়ে আসেন। ১৯০১ সালের ২১ অক্টোবর লক্ষ্মৌতে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ব্যারিস্টার সৈয়দ শরফুদ্দীনের সভাপতিত্বে।
স্যার সৈয়দ আহমদের বন্ধু নওয়াব ভিকারুল মুলক্ এগিয়ে আসেন।
১৯০৬ সালের অক্টোবরে মহামান্য আগা খানের নেতৃত্বে বড় লাট লর্ড মিন্টোর
সঙ্গে সিমলায় সাক্ষাত করেন এবং মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন দাবি করেন।
বিস্ময় যে, ১৪ লাখ ৬১ হাজার ১৮৩ জন সদস্য প্রতিনিধি দলে ছিলেন।।
ঢাকায় সর্ব ভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯০৬ সালের ৩০
ডিসেম্বর। নবাব ভিকারুল মুলক্ ভাষণ দেয়ার পর নবাব স্যার সলিমুল্লাহ নিখিল
ভারত মুসলিম লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
আগা খান সভাপতি এবং নবাব ভিকারুল মুলক্ ও নবাব মোহসীন উল মুলক্
যুগ্মভাবে সম্পাদক হন।
১৯০৭ সালে ডিসেম্বর করাচীতে প্রথম সম্মেলনে বোম্বাই এর স্যার আদমজী
পীরভাই গঠনতন্ত্র পেশ করে তা অনুমোদন করিয়ে নেন।

“মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাতা”

মহামান্য আগা খান, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, ভিকার উল মুলক্, মোহসীন উল
মুলক্, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, লাহোরের শাহ্ দীন, হাকিম আজমল খান,
মওলানা জাফর আলী খান, মওলানা মোহাম্মদ আলী, মওলানা শওকত আলী ও
বোম্বাইয়ের স্যার আদমজী পীরভাই, সৈয়দ আমির আলী প্রমুখ।
লর্ড মিন্টোর আগে লর্ড কার্জন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বঙ্গভঙ্গ আইন পাস
করি বাংলা প্রেসিডেন্সি ভেঙ্গে ফেলেন। পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে একটি এবং
পশ্চিমবঙ্গ নামে আরেকটিটি প্রদেশ হলে মুসলিম লীগ তাকে স্বাগত জানায়।
সর্বভারতীয় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যেমন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিম লীগকে
নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীন পাকিস্তানের অভ্যুদয় ঘটিয়েছেন, ঠিক তেমনি মুসলিম
লীগ থেকে বেরিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটান।

“পাকিস্তানভিত্তিক
আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন”

পাকিস্তান গণপরিষদ এবং মুসলিম লীগ থেকে বহিস্কৃত হওয়ার জের ধরে হোসেন
শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশনায় উভয় অঞ্চলে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা
করা হয়।

প্রথমে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার ঐতিহাসিক রোজগার্ডেনে পূর্বপাকিস্তান
আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং ১৯৫০ সালের ১৩ জুলাই করাচীতে নিখিল পাকিস্তান
আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে দলটি আত্মপ্রকাশ করে, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত
পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের তীব্র বাঁধা-বিপত্তির মুখে।
অবশ্য,দল-প্রতিষ্ঠার নির্দেশনাদানকারী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকার
কর্মীসম্মেলনে উপস্থিত থাকতে পারেননি। নুরুল আমীন সরকার কর্তৃক
পূর্বপাকিস্তানে প্রবেশের ওপর তাঁর নিষেদ্ধাজ্ঞা আরোপিত হওয়ায়।
নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি পদে হোসেন শহীদ
সোহরাওয়ার্দী এবং সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত করা হয় অবাঙালী মাহমুদ
আলী ওসমানীকে।

“পূর্ববাংলা বা পূর্ববঙ্গ এর স্থলে প্রদেশের নাম
পূর্বপাকিস্তান যে কারণে”

সোহরাওয়ার্দী সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা থেকে পূর্ববাংলা বা পূর্ববঙ্গ
নয়, বিভক্ত বাংলার পূর্বাঞ্চলের নাম “পূর্বপাকিস্তান” রাখেন।
নেপথ্যে মূলত, তিনি “পাকিস্তান জাতীয়তাবাদ” প্রবর্তনের আগাম পরিকল্পনা
ব্যক্ত করেন।
কেননা, পাকিস্তান প্রস্তাবক শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গণপরিষদ সদস্য কেড়ে নেয়া
হয় এ বক্তব্যের জের ধরে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান “সোহরাওয়ার্দীকে
অভিহিত করেন পাকিস্তানের দুশমন ও ভারতের লেলিয়ে দেয়া কুকুর” বলে।
পাকিস্তান প্রবর্তক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত
পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের অধিবেশনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দেয়া ওই
প্রস্তাবের মূলে ছিল, জাতীয়তাবাদী চেতনায় স্বাধীন পাকিস্তানকে সকল
ধর্ম-বর্ণের মানুষের উপযোগী স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলা।
গণপরিষদে দেয়া প্রস্তাবে মুসলিম লীগের নাম পাল্টে “জাতীয়তাবাদী লীগ” বা
“জাতীয় লীগ” নামকরণের প্রস্তাব দেন এ পাকিস্তান প্রস্তাবক।

“পাকিস্তান জাতীয়তাবাদ”

১৯৫৪ সালে গভর্নর জেনারেল গোলাম মহম্মদের অনুরোধে কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রী
হওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করেন।
১৯৫৬ সালে গভর্নর জেনারেল জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জার আহবানে
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ করে শাসনতন্ত্রে “এক ইউনিট” পন্থা
গ্রহণ করে তাঁর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার বাস্তবায়নও ঘটান।
তিনি সিন্ধু, বেলুচিস্তান, পশ্চিম পাঞ্জাব প্রদেশকে “পশ্চিম পাকিস্তান”
প্রদেশে পরিণত করেন।
তাঁর নির্দেশনায় এসময় পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামেও একটি দল
গঠন করা হয়। যা বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর অস্তিত্ব হারায়।

“আওয়ামী মুসলিম লীগের
গঠন প্রক্রিয়া”

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী টাঙ্গাইলের অধিবাসী হলেও আসামের
রাজনীতির পুরোধা ছিলেন।
সর্বশেষ তিনি আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি পদে আসীন ছিলেন।
পূর্ববঙ্গের বা পশ্চিম বঙ্গের রাজনীতিতে তাঁর পরিচিতি ছিল না।
দেশ বিভাগের পর আসাম ভারতের প্রদেশে পরিণত হলে বিপাকে পড়েন ভাসানী।
আসামের এক কৃষক আন্দালনে নেতৃত্ব দিয়ে সফল হলে ভাসানচরের মানুষ তাঁকে
“ভাসানী” উপাধী দেয়। কিন্তু আসামের উপাধীকে বহন করে তাঁকে আসাম ছেড়ে
পূর্ববাংলায় চলে আসতে হয়।
“বাঙ্গাল খেদাও” আন্দোলনের তোপে পড়ে ভাসানীকে গ্রেফতারবরণ করতে হয় এবং
আসামের ধুবড়ী জেল থেকে মুক্তি পেয়ে টাঙ্গাইলে নিবাস গড়ে তোলেন।
ঠিক এই সময় একজন সদস্যের মৃত্যুতে টাঙ্গাইল দক্ষিণ আসনটি শূন্য হয়।
তখন উপনির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থী জমিদার হুমায়ুন খান পন্নীর বিরুদ্ধে
মওলানা ভাসানী নির্দলীয় প্রার্থী হন।
তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেও সরকার ফলাফল বাতিল করে।
১৯৫০ সাল পর্যন্ত তাঁকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
আবার উপনির্বাচন দিলে এবার ১৫০ মোগলটুলীর মুসলিম লীগ কর্মীরা শামসুল হককে
হুমাযুন খান পন্নীর বিরুদ্ধে প্রার্থী করে।
শেখ মুজিবুর রহমানসহ কলকাতা ফেরত ছাত্রলীগ নেতাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের
ফলে শামসুল হক বিজয়ী হন। কিন্তু এই ফলাফল বাতিল ঘোষিত হয়।

“মূল দাবী” প্রস্তাবই হলো
দলের ম্যানিফেষ্টো”

২৩ জুনের ঢাকার রোজগার্ডেনে মুসলিম লীগ কর্মীসম্মেলনে “মূল দাবি” নামে
একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন টাঙ্গাইলের শামসুল হক। মূল দাবি প্রস্তাবের
অনুমোদনের মাধ্যমে পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ আনুষ্ঠানিক
আত্মপ্রকাশ করে।
আবুল হাশিম নিখিল বঙ্গ মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম এই দলের
সঙ্গে যুক্ত না হলেও তাঁর ১৫০ মোগলটুলী ক্যাম্পের সমর্থনপুষ্টরাও আওয়ামী
মুসলিম লীগ গঠনের নেপথ্য বিরাট ভুমিকা রাখেন।
সয়ং কর্মীসম্মেলনে ঘোষিত দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক আবুল হাশিমপন্থী
বলে পরিচিত ছিলেন। নিখিল বঙ্গ মুসলিম লীগের সভাপতি হোসেন শহীদ
সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবুল হাশিম।
তিনি সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মতবিরোধের কারণে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের
সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তবে তিনি না থাকলেও তাঁর অনুসারীরা অধিকাংশই
আওয়ামী মুসলিম লীগে শামিল হন।

“মুসলিম লীগের দরজা বন্ধ”

সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলার সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীই শুধু নন, নিখিল
বঙ্গ মুসলিম লীগের সভাপতিও ছিলেন। তাঁকে সরিয়ে মওলানা আকরম খানকে সভাপতি
করা হয়। আর মুখ্যমন্ত্রী হন খাজা নাজিমুদ্দিন। ফলে সোহরাওয়ার্দী
পন্থীদের জন্য মুসলিম লীগের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ
আলী জিন্নাহর মৃর্ত্যুর পর সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। পাঞ্জাবের এককালীন
মুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী খলিকুজ্জামান নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের সভাপতি
হন।
পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন জিন্নাহর স্থলে পাকিস্তানের
গভর্নর জেনারেল পদে আসীন হন। পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেন নুরুল
আমীন। ফলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি টালমাটাল হয়ে পড়ে।
উর্দু হবে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা পাকিস্তানী শাসকদের এই হুঙ্কারে
পূর্বপাকিস্তানে ছাত্রসমাজ গর্জে ওঠে। শেরেবাংলা, মওলানা ভাসানী,মওলানা
তর্কবাগীশ, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, মহিউদ্দীন আহমেদ, তাজউদ্দীন
আহমেদ, অলি আহাদ, গাজীউল হকসহ সর্বমহল মাতৃভাষা বাংলা চাই দাবিতে
সোচ্চার হয়ে ওঠে। গঠিত হয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদ।

“ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা”

ভাষা সংগ্রাম সূচনার আগেই নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে একটি
গ্রুপ ছিল খাজা নাজিমুদ্দিন পন্থী, যার নেতৃত্বে ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান
এবং অন্যটি ছিল সোহরাওয়ার্দী পন্থী, যার নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুজিবুর
রহমান। শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন উপদলটি ১৯৪৮ সালের চার জানুয়ারি থাকা
বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক মুসলিম হল মিলনায়তনে মিলিত হয়ে “পূর্বপাকিস্তান
মুসলিম ছাত্রলীগ” নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটায়। এবং ভাষা সংগ্রামে
অগ্রণী ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়। শেখ মুজিবসহ ছাত্রলীগ নেতারা কারারুদ্ধ হলে
জনমত তাদের পক্ষে যায়।

ধীরে ধীরে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের পকেট সংগঠনে পরিণত হওয়ায় অচিরেই শাহ
আজিজুর রহমান ও শামসুল হুদা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন নিখিল পাকিস্তান মুসলিম
ছাত্রলীগ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। সোহরাওয়ার্দী পন্থীরা মুসলিম লীগের
সদস্যপদ লাভের জন্য প্রথমে মওলানা আকরম খান ও পরবর্তীতে করাচীতে গিয়ে
আনোয়ারা খাতুন এমএলএ ও আতাউর রহমান খান চৌধুরী খলিকুজ্জামানের দ্বারস্থ
হয়েও বিমুখ হয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন।
ভক্তানুসারীদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সোহরাওয়ার্দী করাচী থেকে ঢাকায় আসার
উদ্যোগ নেন। স্টিমারযোগে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছলে ওখান থেকেই সংশ্লিষ্ট
কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রের নির্দেশনামা প্রদর্শন করে তাঁকে পূর্ববাংলায়
নিষিদ্ধ ঘোষিত করেন।
১৯৪৯ সালের ৯ জুন সোহরাওয়ার্দী আবার ঢাকায় আসেন। ছাত্রলীগের অস্থায়ী
আহবায়ক দবিরুল ইসলামের হেবিয়ার্স কর্পাস মামলা পরিচালনার জন্য।
এরপর ভারত বিভাগপূর্ব আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের পদচ্যুত সভাপতি
মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সামনে রেখে দলগঠনের আনুষ্ঠানিক
প্রক্রিয়া শুরু হয়।

“রোজগার্ডেন”

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন
অনুষ্ঠিত হয়। ১৫০ মোগলটুলী মুসলিম লীগ ক্যাম্পের সোহরাওয়ার্দী ও আবুল
হাশিম পন্থী কর্মীরাই মূলত মূল শক্তিরূপে আবির্ভূত হন। কর্মীসম্মেলনটি
শুরু হয় মওলানা রাগীব আহসানের কন্ঠে পবিত্র কোরআনের বানী তেলওয়াতের মধ্য
দিয়ে। মূল দাবি শিরোনামে শামসুল হক যে প্রস্তাবটি সম্মেলনে উত্থাপন
করেন, সেটাই পাস হয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের মেনিফ্যাস্টোরূপে গৃহীত হয়।
দলগঠনের অন্যতম কান্ডারী ও ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান
কারাগারে থেকেই এর প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেন।

চলবে ………………….. ।

সম্পাদক ও প্রকাশক : খন্দকার রাকিব ।
ফকির বাড়ি, ৫৫৪৫৪ বরিশাল।
মোবাইল: ০১৭২২৩৩৬০২১
ইমেইল : rakibulbsl@gmail.com, barisalcrimenews@gmail.com